সন্তান ও পিতামাতার হক

 

সন্তান ও পিতামাতার হক

সন্তান ও পিতামাতার হকঃ সন্তানের সাথে পিতামাতার আত্মীয়তাই সর্বাধিক মজবুত ও নিকটবর্তী। তাই অন্যান্য আত্মীয়ের চেয়ে পিতামাতার হক বেশী। পিতামাতা সম্পর্কে রাসূল করীম সঃ বলেনঃ

সন্তান যদি পিতাকে গোলাম পায় অতঃপর তাকে ক্রয় করে মুক্ত করে, তবুও পিতার হক আদায় হবে না। তিনি আরও বলেনঃ পিতামাতার সাথে সদাচরন করা নামায, রোযা, হজ্জ, ওমরা ও আল্লাহর পথে জেহাদ করার চেয়ে উত্তম। আরও বলা হয়েছে-যে ব্যক্তি সকালে পিতা ও মাতা  উভয়কে সন্তুষ্ট করবে, তার জন্য জান্নাতের দিকে দুটি দরজা খুলে যায়। সন্ধ্যায় যে এরুপ করে, তার জন্যও তাই হয়। পিতামাতার মধ্যে একজন থাকলে এক দরজাই খুলবে-যদিও তারা উভয়েই যুলুম করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সকালে পিতামাতাকে নারাজ করে, তার জন্য দোযখের দিকে দুটি দরজা খুলে যায়। আর যে সন্ধ্যায় নারাজ করে, তার অবস্থাও তদ্রুপ। একজন থাকলে এক দরজা খুলবে-যদিও তারা যুলুম করে।একথাগুলো তিনি তিনবার উচ্চারণ করলেন।এক হাদীসে আছে-জান্নাতের সুগন্ধি পাঁচশ’ বছরের দূরত্ত থেকে জানা যায়। কিন্তু নাফরমান সন্তান ও আত্মীয়তা ছিন্নকারী তার ঘ্রান পাবে না।

আরও বলা হয়েছে, আপন পিতামাতা, ভাইবোন ও অন্যান্য আত্মীয়দের প্রতি আত্মীয়তার নৈকট্য অনুযায়ী অনুগ্রহ কর।বর্ণিত আছে, আল্লাহ তায়ালা মুসা আঃ কে বললেন,হে মুসা, যে ব্যক্তি তার পিতামাতার আনুগত্য করে, আমি তাকে অনুগত লিখি। আর যে ব্যক্তি পিতামাতার নাফরমানি করে ও আমার আনুগত্য করে, আমি তাকে নাফরমান লিখি।

কথিত আছে, যখন হযরত এয়াকুব আঃ আপন পুত্র হযরত ইউসুফ আঃ এর কাছে মিসরে গেলেন, তখন হযরত ইউসুফ আঃ দাড়াননি। আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি ওহি পাঠালেন, তুমি তোমার পিতার সম্মানার্থে দন্ডায়মান হওয়াকে কঠিন মনে করলে কি? আমার ইজ্জত ও প্রতাপের কসম, তোমার ঔরস থেকে কোন নবী পয়দা করব না। রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেন, কেউ সদকা দিতে চাইলে আপন পিতামাতার নামে দিতে পারে যদি তারা মুসলমান হয়। এই সদকার সওয়াব তারা উভয়ে পাবে এবং পুত্রও তাদের সমান সওয়াব পাবে-তাদের সওয়াব হ্রাস করা ব্যতীতই।

মালেক ইবনে রবীয়া(রাঃ) বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ সাঃ এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। ইতিমধ্যে বনী ছালামার এক ব্যক্তি এসে আরজ করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার পিতামাতা মারা গেছেন। আমার উপর তাদের আদায় করার মত কোন হক আছে কি? তিনি বললেনঃ তাদের জন্য নামাজ পড়, মাগফেরাতের দোয়া কর,তাদের অংগীকার অছিয়াত পূর্ণ কর, তাদের বন্ধুদের সম্মান কর এবং তাদের কারনে যেসব আত্মীয়তা আছে, সেসব বজায় রাখ। তিনি আরও বলেন, মায়ের সাথে সদাচরণ পিতার তুলনায় দীগুন। আরও বলা হয়েছেঃ মায়ের দোয়া দ্রুত কবুল হয়। এর কারণ জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি বললেনঃ মা পিতার তুলনায় অধিক মেহেরবান হয়ে থাকে। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাঃ কে জিজ্ঞাসা করলঃ আমি কার সাথে সদাচরন করব? তিনি বললেনঃ পিতামাতার সাথে। লোকটি বলল, আমার পিতামাতা নেই। তিনি বললেনঃ আপন সন্তানের প্রতি অনুগ্রহ কর। তোমার পিতা-মাতার যেমন তোমার উপর হক আছে, তেমনি তোমার সন্তানের হক আছে।

এক হাদীসে আছে-আল্লাহ সেই পিতার প্রতি রহম করুন, যে তার সন্তানকে সৎ হতে সাহায্য করে; অর্থাৎ এমন মন্দ কাজ করে না, যদ্দারা সন্তান নাফরমান হয়। কথিত আছে, সন্তান সাত বছর বয়স পর্যন্ত পিতার খেলনা ও ফুলের তোড়া, আরও সাত বছর পর্যন্ত খাদেম, এরপর হয় দুশমন, নয় শরীফ। আনাস রাঃ এর রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেনঃ সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে তার নাম রাখবে ও আকীকা করবে এবং চুল ইত্যাদি পরিস্কার করবে। ছয় বছর বয়স হলে তাকে আদব শিক্ষা দিবে। বয়স নয় বছর হলে তার বিছানা আলাদা করে দেবে। তের বছর বয়স হলে তাকে নামাজ পড়ার জন্য প্রহার করবে। যখন বয়স ষোল বছরে পৌছে, তখন বিয়ে করাবে এবং হাত ধরে বলবে-আমি তোমাকে আদব শিখিয়েছি, লেখাপড়া এবং বিয়ে করিয়েছি। এখন আমি আল্লাহতায়ালার আশ্রয় প্রার্থনা করি তোমার ফিতনা থেকে এবং আখেরাতে তোমার আযাব থেকে। এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে-সন্তানের হক পিতার উপর এই যে, তাকে ভাল আদব শিখাবে এবং তার ভাল নাম রাখবে।

এক ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারকের কাছে আপন পুত্রের বিরুদ্দে অভিযোগ করল। তিনি বললেনঃ তুমি কখনো তাকে বদদোয়া করেছ কি?সে বললঃ হা। তিনি বললেনঃ তা হলে তুমি নিজেই তাকে নষ্ট করেছ। এখন এর কি প্রতিকার! সন্তানের প্রতি দয়া ও নম্রতা করা মোস্তাহাব। আকরা ইবনে হারেস রাঃ রাসুলুল্লাহ সাঃ কে দেখলেন যে, তিনি শিশু ইমাম হাসানকে আদর করছেন। আকরা আরজ করলেনঃ আমার দশটি সন্তান আছে, আমি তাদের মধ্যে কাউকে আদর করিনি। রাসুলুল্লাহ সাঃ বললেনঃ “যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না”

হজরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) এর বিখ্যাত গ্রন্থ   এহইয়াউ উলুমুদ্দীন-২য় খন্ড থেকে গৃহীত

*************************

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.